-: প্রবাসের পুজো : পুজো আসলেই মন ছুটে যায় পাড়ার মণ্ডপে :-

-: পুজো আসলেই মন ছুটে যায় পাড়ার মণ্ডপে :-

প্রবাসের পুজো……….সব্যসাচী ঘোষ :-

ছেলেবেলা থেকেই আড্ডাপ্রবন ফালাকাটার রুপম তালুকদার কর্মসূত্রে এখন লন্ডনে। সেখানে তিনি ১২ বছর ধরে আছেন। কাজের ছুটি পেলেই একছুটে চলে আসেন বাবা মা বন্ধুদের পুরোনো আড্ডায়। পুজোয় তার আসা হয়ে ওঠেনা কিন্তু ফালাকাটার পুজোর পুরোনো স্মৃতি, ক্যাপ বন্দুক, বেলুন ফুলিয়ে ফাটানো, সবাই মিলে হৈহুল্লোর, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, পুজো মণ্ডপে পড়ে থাকা সবই তরতাজা এখনো রূপমের মনের মণিকোঠায়। লন্ডনের পুজোও উপভোগ করেন রূপমবাবু। সেখানের প্রবাসী বাঙালিরা মিলে ধুমধামের সাথে পুজোর আয়োজন করেন।

বেশ কয়েকটি বড় পুজোর মধ্যে একটি হলো ওল্ড ফোর্ড রোডে ইয়র্ক হলে সনাতন সমিতির পুজো। এছাড়াও ব্রডওয়ের এলিং টাউন হলে এল এস ইউ এর দুর্গা পুজো ও লন্ডন দুর্গোৎসব কমিটির পুজোও বেশ সাড়ম্বরে পালিত হয়। পুজোর নির্ঘন্ট মেনে একদম নিষ্ঠার সাথে মা দুর্গার আরাধনা করেন লন্ডন নিবাসী বাঙালিরা। ঢাক কাসর ধুনুচি নাচ এমনকি দশমীর দিন সিঁদুর খেলা কিছুই বাদ যায় না জানান রূপমবাবু। তিনদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি চলে খাওয়াদাওয়া। ‘কিন্তু পাড়ার পুজোর অসীম আনন্দ এখানে কোথায় যেন একটা গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়’ লন্ডন থেকে জানান রুপম তালুকদার।

ফালাকাটার মেয়ে চৈতালি বোস একবছর ধরে আছেন লস এঞ্জেলেসে। শেষ দুই পুজো কাটিয়েছেন ইউএসএর ইস্ট কোস্টের আর এক শহর ক্যানসাসে। সেখানেও পুজো হয় অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আনন্দের সাথে। ক্যানসাসে বাঙালি সম্প্রদায়ের সংখ্যা বেশ ভালোই। সেখানে চারটি বড় পুজো হয়। দেদার খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি বিচিত্রা অনুষ্ঠান হয়। এমনকি প্রতিবছরই বাংলা ব্যান্ড ও সঙ্গীত শিল্পীদের নিয়ে বড় অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয় দুর্গা পূজার সময়। চৈতালির ফালাকাটার বাড়ির পুজো বনেদি যা এবছর ৯১ তে পা রাখলো। তিনবছর ধরে বাড়ির পুজোর আনন্দের ভাগিদার হতে পারছে না চৈতালি। ‘বছরের অন্যান্য সময় যেমন তেমন কিন্তু পুজো আসলেই পুজোতে ভাইবোন দের সাথে জমিয়ে আড্ডা হুল্লোড়ের কথা মনে পড়ে তখন ভিনদেশের শত ভিড়েও মন উদাস হয়ে যায়’ লস এঞ্জেলেস থেকে জানায় চৈতালি।

বর্তমানে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে আছেন কোচবিহারের অনামিত্র রায়। বাড়ি কোচবিহারে হলেও অনামিত্রের স্কুল জীবন ফালাকাটায়। কাজেই ছেলেবেলার পুজোর স্মৃতি বলতে শুধুই ফালাকাটা। ব্রাসেলস থেকে সে জানায় সেখানে বাঙালি সম্রদায় মিলে দুটো বড় পুজোর আয়োজন করে। একটি ব্রাসেলস সন্মেলনী আর একটা হলো সর্বজনীন পুজো সমিতি দুটো পুজোতেই আড্ডা দিতে যান অনামিত্র। ‘ঢাকের বাদ্য , ধুনুচি নাচ, আরতি আর গানের মধ্য দিয়ে পুজো প্রাঙ্গন ষোলোয়ানা বাঙালিয়ানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু কোথায় যেন একটা কিছু বাকি থেকে যায় , বন্ধুদের পাঠানো ছবি দেখে পাড়ার পুজোর আস্বাদ নেই তবু অতৃপ্তই থেকে যায় মন…’ খানিকটা বেসুরো শোনায় অনামিত্রকে।

লন্ডন নিবাসী রুপম তালুকদার জানান, পুজোর চারদিন চেষ্টা করেন স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে যতটা সময় পাওয়া যায় লন্ডন শহরের পুজো মণ্ডপ গুলোতে সময় কাটাতে। সপ্তমী অষ্টমী নবমী তিনদিনই চণ্ডীপাঠ ও পুজোর পাশাপাশি সন্ধ্যায় হল ঘরে নানান রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অষ্টমীতে প্রতিবার নিয়ম করে অঞ্জলি দিয়ে থাকেন পরিবারের সবাই মিলে। নবমী স্পেশাল অবশ্যই আরতি ও ধুনুচি নাচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ আর দশমীতে মহিলারা যখন সবাই মিলে সিঁধুর খেলায় মেতে ওঠে পুরুষরাও আবির খেলার মধ্যে দিয়ে মা দুর্গার বিদায় জানান।

লন্ডনের মতো ক্যানসাস, লস এঞ্জেলেস ও ব্রাসেলসেও বাঙালি কমিউনিটির লোকেরা একত্র হয়ে পুজোর চারটা দিন যতটা সম্ভব পরিবারের সাথে কাটাতে পারেন সেই চেষ্টাই করেন। প্রতিদিনই পুজোর পর ভোগ বিতরণের পাশাপাশি সন্ধ্যায় নাচ গান আবৃত্তির ঘরোয়া জলসা হয়ে থাকে। বাংলা ব্যান্ডের পাশাপাশি বাংলার বিশিষ্ট সংগীত শিল্পীদের নিয়ে সংগীতানুষ্ঠানও পুজোর সময় আয়োজন করা হয় বলে জানায় অনামিত্র ও চৈতালিরা। কিন্তু হাজারো আয়োজন হাজারো আনন্দের মাঝে কোথায় যেন মন ছুটে যায় পাড়ার ওই মণ্ডপে ওই হইহুল্লোড়ে, পাড়ার ওই ক্যাপ বন্দুক আর বেলুনের দেশে, মন ছুটে যায় আকাশে আমার স্বদেশে….

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *